অফিসে সহকর্মীরা যখন বার বার বু’কের দিকে তাকান! মোকাবিলার কথা জানালেন তিন কন্যা

কাজের জায়গায় মেয়েদের নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সব কিছু আবার ক্রাইম বলে প্রমাণও করা যায় না, যেমন এই বিশেষ সমস্যাটি।

বেশ কয়েক বছর আগে দীপিকা পাডুকোন এক বিশেষ সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে একটি টুইট করেন। সেই টুইট নিয়ে সারা দেশেই তোলপাড় হয়। দীপিকা লিখেছিলেন যে হ্যাঁ, তিনি একজন নারী, তাঁর স্ত’ন আছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর ক্লি’ভেজও আছে। আর তাঁর ক্লি’ভেজ নিয়ে একটুও বিব্রত নন তিনি।

দীপিকার মতো করে ভাবেন, এমন মেয়েদের সংখ্যা এদেশে কিছু কম নয়। এবং এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে শুধুমাত্র সমাজের উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চবিত্ত স্তরের মেয়েরাই এমনটা ভাবেন। যে মেয়েরা তাঁদের পুরুষ সঙ্গীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাথর ভাঙেন, অথবা ইঁট বয়ে আনেন কনস্ট্রাকশন সাইটে, তাঁরাও ক্লি’ভেজ বা অঙ্গ প্রদর্শন নিয়ে মাথা ঘামান না। কাজের সময়ে শাড়ির ফাঁকে তাঁদের কোমর বা বুক দেখার আগ্রহ এবং ‘দায়’টা বিকৃত পুরুষের, তাঁদের নয়।

কিন্তু যাকে আমরা অফিস বা সাজানো-গোছানো কাজের জায়গা বলি, সেখানে সমীকরণগুলি অন্য রকম। কাজের সময়ে পুরুষ সহকর্মীদের চোখ বার বার যদি কারও বুকের দিকে যায়, তবে ঠিক কীভাবে সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচাবেন মহিলারা! এই বিশেষ বিষয়টি এমন যে , তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করা যায় না। তবে?

অনন্য়া বিশ্বাস

অভিনেত্রী অনন্যা বিশ্বাস বললেন, ‘‘সবাই জানে, আমি যা বলি, মুখের ওপর বলি। কথা বলার সময়ে কেউ আমার সঙ্গে এটা করলে, আমি তাকে সরাসরি বলব যে— আপনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। তার পরেও যদি সে কথা না শোনে, তবে কথাটা সম্পূর্ণ না করেই আমি সেই জায়গা ছেড়েই চলে যাব। আর তাকে বলে দেব যে, তার সঙ্গে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে যে কেউ হতে পারে, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, যে কেউ।’’

এখানে অবধারিত ভাবে একটা প্রসঙ্গ আসবে। যাঁরা মেয়েদের পোশাক নিয়ে ছুঁৎমার্গে বিশ্বাস করেন, তাঁরা বলবেন যে মেয়েরা যদি অফিসে বা কাজের জায়গায় এমন কোনও পোশাক পরে আসেন যাতে তাঁদের ক্লি’ভেজ উন্মুক্ত, তবে তো সেটা সবাইকে দেখানোর জন্যেই। সহকর্মীরা দেখলে সেখানে দোষ কী?

সঙ্গীতা দাস

দোষটা আসলে দেখার ভঙ্গিমাতে। কোনও মা যখন সবার সামনে সন্তানকে স্ত’ন্যপান করান, দু’ধরনের পুরুষ সেটা তাকিয়ে দেখেন। একদল যাঁরা মা ও সন্তানকে দেখেন এবং অন্যদল, যাঁরা শুধুই স্ত’ন দেখেন। সহকর্মীর কাছে আকর্ষণীয় হতেই পারেন কোনও নারী, কিন্তু কাজের কথা বলার সময় তাঁর ক্লি’ভেজের দিকে তাকানো, আসলে সেই নারীর পেশাদারিত্বকে অসম্মান করা! আর সেটা বিকৃতির পরিচয়।

কাজের জায়গায় এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকবার পড়েছেন জনসংযোগ কর্মী সঙ্গীতা দাস। জানালেন, ‘‘আমার সঙ্গে অনেক বার এমনটা ঘটেছে, অনেকের সঙ্গেই ঘটে। আমার মনে হয়, সরাসরি বলে দেওয়া উচিত। আমি এখন যেখানে কাজ করি, সেখানে এরকম কিছু হয়নি কিন্তু আগের অফিসে ঘটেছে। আর সেখানে আমি কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় আমার বিরক্তির কথা জানিয়েছি।’’

লাবণী ভট্টাচার্য

তবে অভিনেত্রী লাবণী ভট্টাচার্য সম্পূর্ণ অন্য পার্সপেক্টিভ থেকে এই সমস্যাকে দেখছেন। টেলিভিশনের এই অভিনেত্রীর মতে, যুক্তি, এথিকস, সৌজন্যবোধ, মেয়েদের সম্মান প্রদর্শন, এগুলো তো সব পুরুষ সহকর্মীদেরই জানা। তার পরেও তো একই জিনিস ঘটতে থাকে। তাই একটু অন্যভাবে এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যাক।

লাবণী জানালেন, ‘‘কেউ যদি কথা বলতে বলতে বার বার এমনটা করে, তাহলে আমি কিচ্ছু না বলে, হাঁটু মুড়ে নীচু হয়ে যাব, তাহলে তার চোখের লেভেলে আমার চোখটা এসে যাবে। তখন নিশ্চয়ই সে বুঝবে। একবারে না বুঝলে, বার বার এমনটা করব এবং হাসতে হাসতে করব। তার পরে নিশ্চয়ই তার একটু লজ্জা করবে!’’

‘‘এ কী! এই পোশাক পরে তুমি বিয়েবাড়ি যাবে? তোমার না থাকতে পারে, আমার একটা সম্মান আছে।’’ স্ত্রী’র খোলামেলা পোশাক দেখে বিরক্ত স্বামীর এহেন উক্তি শুনতে যতই নাটকীয় লাগুক, এটা কেবল মেগা সিরিয়াল বা বাণিজ্যিক ছবির সংলাপ মাত্র নয়। ছাপোষা মানুষের অন্দরমহলেও এমন বিষাক্ত উক্তি মোটেই বিরল নয়। অনেকে আবার এমনও আছেন, যাঁরা মুখে হয়তো কিছু বলছেন না, কিন্তু তাকিয়ে দেখতে থাকেন, তাঁর সঙ্গিনীকে কেউ বক্র দৃষ্টিকে দেখছে কি না।

অথচ এদেশেই লেখা হয়েছে বাৎসায়নের ‘কা’মসূত্র’। অজন্তা-ইলোরার ছবি ও ভাস্কর্যও এদেশেরই। তবু শরীর নিয়ে এক আশ্চর্য ‘ট্যাবু’ রয়ে গিয়েছে আজও। নায়িকা বৃষ্টিতে ভিজে নেচে উঠলে অন্ধকার হলে সিটির বন্যা বয়ে যায়। অথচ নিজের স্ত্রী বা প্রেমিকার পোশাক নিয়ে তীব্র মাথাব্যথা। যেন পোশাক এক ইঞ্চি কম বা বেশির উপরেই নির্ভর করছে সম্মানের ব্যালান্স-ক্রীড়া।

‘‘হ্যাঁ, আমি একজন মহিলা। আমার স্ত’ন আছে এবং ক্লি’ভেজও। আপনাদের কী সমস্যা?’’ কয়েক বছর আগে অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনের সেই বিস্ফোরক উক্তি হয়তো মনে আছে অনেকেরই। দেশের এক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির তলায় প্রকাশিত একটি ক্যাপশনের উত্তরেই ক্ষুব্ধ দীপিকা এমন মন্তব্য করেছিলেন। সেই সময়ে দীপিকার মন্তব্যের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন অন্য তারকারাও। অনেকেই তাঁর সেই টুইটকে রিটুইট করেছিলেন।

দীপিকার ঘটনা একটা উদাহরণ মাত্র। কিন্তু সেই ঘটনা ভারতীয় জনমানসে ‘শরীর’-এর আবেদনকে বুঝতে সাহায্য করে। ‘শরীর’-এর ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ এমনই, যে নায়িকার খোলামেলা পোশাক পরা ছবি দেখে পাবলিক খুশি হয়, তারাই আবার নিজের সঙ্গীর পিঠখোলা কিংবা ক্লি’ভেজ দেখানো ব্লা’উজ, উ’রু দেখানো শর্ট স্কার্টে অস্বস্তিতে ভোগে।

বহু মহিলাই অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন, যখন তাঁরা দেখেন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময়ে সামনের পুরুষটির চোখ বার বার চলে যাচ্ছে তাঁর সূক্ষ্ণ ক্লি’ভেজের ফাঁকে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, পুরুষের চোখে নারীর সৌন্দর্য অনেকটাই থমকে রয়েছে সঙ্গিনীর স্ত’নের আকৃতির উপরে।

একটি মনোবিজ্ঞানের ওযেবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার এক গবেষক দল জানিয়েছেন, ১৮ থেকে ৬৫ বছরের প্রায় ৫২ হাজার পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে, ৫৬ শতাংশ পুরুষ সঙ্গিনীর স্তন নিয়ে খুশি। পাশাপাশি উঠে আসছে আর একটা চমকে দেওয়া তথ্যও।

মাত্র ৩০ শতাংশ মহিলা নিজেদের স্ত’ন নিয়ে সন্তুষ্ট। বাকিরা নন! তবে দুটোর মধ্যে ফারাক আছে। পুরুষের স্তনপ্রিয়তা পুরোপুরি যৌ’নতাময়। অন্যদিকে নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টা একেবারেই আলাদা ও বহুমুখী। তবে মূল সুরটা একই, আমাকে পুরুষের চোখে সেরা হতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ এক বড় বালাই।

সে যাই হোক, কথা হচ্ছে খোলামেলা পোশাক পরা নিয়ে। আমেরিকান অভিনেত্রী ক্রিস্টিনা হেনড্রিকস জানিয়েছিলেন, ক্লি’ভেজ দেখানো পোশাক পরলে নিজেকে শক্তিশালী মনে হয়। সবাই তাঁর দিকে দেখছে এই অনুভব তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

তবে সকলেই যে ক্রিস্টিনার মতো করে ভেবে ক্লি’ভেজ দেখান, তা তো নয়। তাছাড়া যতই আমরা ভুবন গ্রাম বলে চিৎকার করি না কেন, মার্কিন সমাজ আর ভারতীয় সমাজের চেহারা এক নয় মোটেই। আমরা ‘শরীর’ দেখে হলে বসে সিটি মারি, অথচ সঙ্গিনীর পোশাকের খাঁজে অন্যের দৃষ্টি আটকে গেলে অস্বস্তিতে ভুগতে থাকি। তাই শরীরকে প্রকৃত সম্মান ভারতীয়রা আর করতে পারল কই।

তবে সকলেই ‘ঝাঁকের কই’ নয়। ব্যতিক্রম তো আছেই। কিন্তু, ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই স্পষ্ট করে। তাই প্রেমিকার খোলামেলা পোশাক পরা নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে তুমুল মনোমালিন্যের পরে মাথা ঠান্ডা করতে ইউটিউবে সেই প্রেমিকই চালিয়ে দেয় ‘তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত’-এর নতুন রিমিক্স!

৫০০০+ মজদার রেসিপির জন্য Google Play store থেকে Install করুন “Bangla Recipes” মোবাইল app…. 🙂
.
মোবাইল app Download Link >>> Bangla Recieps App

Loading...